হাওরে আশার বৃষ্টি, উৎকণ্ঠার বাঁধ
- আপলোড সময় : ১৬-০৩-২০২৬ ১২:৩৯:৪৬ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৬-০৩-২০২৬ ১২:৩৯:৪৬ অপরাহ্ন
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে কয়েক দিনের বৃষ্টিপাত কৃষকের মনে যেমন স্বস্তির পরশ বুলিয়েছে, তেমনি ঝড়, শিলাবৃষ্টি ও দুর্বল ফসলরক্ষা বাঁধ আবারও সেই পুরোনো আতঙ্ককে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। হাওরের কৃষকের জীবনে বোরো ধান শুধু একটি ফসল নয়, এটি তাদের বছরের একমাত্র বড় ভরসা, বেঁচে থাকার অবলম্বন। তাই বৃষ্টি এখানে কখনও আশীর্বাদ, কখনও শঙ্কার অন্য নাম।
এ সময় বোরো ধানের শীষ বের হওয়ার মৌসুম। কৃষিবিজ্ঞানের ভাষায়ও এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। স্বাভাবিক বৃষ্টি ফসলের জন্য উপকারী হলেও অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি কিংবা অকাল পাহাড়ি ঢল মুহূর্তে কৃষকের সারা বছরের ঘাম মাটিতে মিশিয়ে দিতে পারে। হাওরপাড়ের মানুষের এই শঙ্কা তাই অমূলক নয়; বরং বহু বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই এই উদ্বেগের জন্ম।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো ফসলরক্ষা বাঁধ। প্রতিবছর সরকারি অর্থ বরাদ্দ হয়, প্রকল্প নেওয়া হয়, সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়, তদারকির আশ্বাসও শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নির্ধারিত সময় পেরিয়েও বহু স্থানে কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কোথাও মাটি ঠিকভাবে বসেনি, কোথাও ঘাস লাগানো হয়নি, কোথাও আবার বাঁধের গঠনই দুর্বল। ফলে সামান্য বৃষ্টি কিংবা ঢলের সম্ভাবনার খবরেই হাওরাঞ্চলে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। এটি কেবল প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা নয়, এটি কৃষকের জীবন-জীবিকার প্রতি অবহেলারও পরিচায়ক।
হাওরের বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণকে আমরা এখনো মৌসুমি প্রশাসনিক কাজ হিসেবে দেখি। অথচ এটি হওয়া উচিত বারোমাসি পরিকল্পনা, আগাম ঝুঁকি মূল্যায়ন ও জবাবদিহিনির্ভর ব্যবস্থাপনার অংশ। কাজ শেষ হওয়ার কথা ২৮ ফেব্রুয়ারি, পরে আবার সময় বাড়ানো হলো। কিন্তু সময়সীমার শেষ দিনেও যদি কাজ বাকি থাকে, তবে প্রশ্ন উঠবেই- দায় কার? শুধু কাজ চলছে বললে হবে না; কাজ কতটা মানসম্মত হয়েছে, কতটা টেকসই হয়েছে, সেটিই এখন মুখ্য বিষয়।
হাওরাঞ্চলে বাঁধ মানেই কেবল মাটির কাঠামো নয়; এটি কৃষকের অন্নের দেয়াল। সেই দেয়াল দুর্বল হলে কৃষকের মনে অনিশ্চয়তা তৈরি হবেই। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতি বছর একই অভিযোগ, একই শঙ্কা, একই ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। তাহলে কি আমরা অতীত থেকে শিক্ষা নিচ্ছি না? নাকি দুর্বলতা, গাফিলতি ও অনিয়মকে এক ধরনের স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়েছি?
এখনো সময় আছে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো দ্রুত মেরামত করতে হবে। যেসব প্রকল্পে কাজ বাকি, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে জনবল ও উপকরণ বাড়াতে হবে। মাঠপর্যায়ে প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি বিভাগ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, গাফিলতি বা নি¤œমানের কাজের অভিযোগ থাকলে তাৎক্ষণিক তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু আশ্বাস দিয়ে হাওরের কৃষককে আর শান্ত রাখা যাবে না।
হাওরের কৃষক বারবার প্রমাণ করেছেন, প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় অসামান্য অবদান রাখেন। সেই কৃষকের ফসল রক্ষায় রাষ্ট্রের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বৃষ্টি হাওরে আশার বার্তা নিয়ে আসুক, কিন্তু দুর্বল বাঁধ সেই আশাকে যেন আবারও তলিয়ে না দেয় - এটাই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রত্যাশা।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়